পাহাড়ীদের বিলুপ্তপ্রায় জীব-বৈচিত্র্য ধরে রাখার স্বপ্নে “ইয়াং বং হাউস”

প্রকাশিত: ৯:৪৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৭, ২০২০

কিকিউ মার্মা, বান্দরবান।।

ছোটবেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটির ‘মনোঘর অনাথ আশ্রম’ থেকে স্কুল জীবন শুরু করেছেন। সেখানে কেটে যায় দশটি বছর। তারপর ঢাকা নটরডেম কলেজে দুই বছর কাটানোর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজি বিভাগে (২য়) বর্ষের ছাত্র।

ছোটকাল থেকে বেড়ে উঠেছেন অন্যের হাত ধরে। লেখাপড়ার তাগিদে এই পর্যন্ত জীবনের ষোলটি বছর পার করেছেন গ্রামের বাইরে। তেমন করে গ্রামে আসারও সুযোগ হয়ে উঠেনি। শুধুমাত্র স্কুল ছুটিতে বা অন্য কোন কাজের সুযোগ পেলে দুই-তিনদিন বা সপ্তাহখানিক থাকা হয়। এর বাইরে আসলে নিজ জম্মস্থানে আসা হয়নি।

যখনই সে গ্রামে আসে পাহাড়ে একা একা এদিক-সেদিক ঘুরে সময় কেটে যায়। তাছাড়া তার কথাগুলো শোনার মত তেমন লোক নেই বললেই চলে। ঘুরতে ঘুরতে একসময় এখানকার নানান সমস্যা দেখতে পায় এবং সেগুলো উপলব্ধি করতে থাকে। হঠাৎ একদিন এক জায়গায় অনেকক্ষণ বসে ভাবতে শুরু করলেন। অত্র এলাকার আদিবাসীরা বিশেষ করে পাহাড়ী অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীরা এখনও অনেককিছু থেকে পিছিয়ে আছে। পাহাড়ী অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীদের জন্য কিছু একটা করতে তার উপলব্ধি জাগে। বিশ্ববিদ্যালয় খুললে আবারও ছুটে যেতে হবে সেই গন্তব্যে। এ সময়ে বেকার না থেকে কিছুটা অর্থ উপার্জনের পথ তৈরি করা আর নিজ উদ্দেশ্যকে হাসিল করা তার মূল সংগ্রাম ছিল।

তার নাম দন ওয়াই ম্রো। চিম্বুক সড়কে রোয়াংছড়ি মৌজা জামিনি পাড়ার বাসিন্দা কারবারি (গ্রামপ্রধান) মেনরং ম্রো- এর ছেলে। অভাব-অনটনের সংসারে আট ভাই বোনের মধ্যে সে ৪র্থ সন্তান। তার বড় ভাই আর বোন সংসার জীবন শুরু করেছেন। বাকি ভাই -বোনরা লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে।
খুব ভোর থেকে শুরু করে সন্ধ্যা ৭টা অবধি  দোকান পরিচালনা করেন। দিনে গড়ে প্রায় ১৭শ টাকা বিক্রি হয়ে থাকে। সেখান থেকে ৫০০-৬০০ টাকা আয় হয়। সেই টাকাগুলো আপাতত জমিয়ে রাখছেন।

সামান্য আয়ের টাকা জমিয়ে রাখার মূল উদ্দেশ্য  হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিলুপ্তপ্রায় জীবন-বৈচিত্র্যের ছবি ও বই সংগ্রহ করে রাখা। কয়েকটি বই আর ছবি ইতোমধ্যে কিছুটা সংগৃহীত হয়েছে।

বিশ্বের মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় টানা ছুটিতে তার নিজ মাতৃভূমিতে আসা হয়েছে। করোনা মনে হয় তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। দন ওয়াই ম্রো- এর গড়ে তোলা স্বপ্নের কুটিরে চা খেতে খেতে কথা হয় দেশ অরণ্য প্রতিবেদকের সাথে।

তার স্বপ্নের কুটির শুরু করার প্রসঙ্গে বলেন, “প্রথমে স্থান নির্ধারণ করেছি। তাছাড়া এখানে ভালো ইন্টারনেট পাওয়া যায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকরা মূলত পাহাড়ী প্রকৃতিকে দেখতে আসেন। এখানকার প্রকৃতিকে ব্যবহার করে ছোটখাট বিশ্রামাগার হিসেবে কুটির তৈরি করার পরিকল্পনা করি। সেখানে থাকবে চা-কফি আর পাহাড়ীদের উৎপাদিত রকমারি ফল। পাশাপাশি এখানে আসা লোকজনের সাথে আমার কথাগুলো শেয়ার করতে পারবো।”

আসলে মানুষের ইচ্ছাশক্তি থাকলেই সবকিছু হয় না। ইচ্ছে পূরণের জন্য প্রয়োজন একমাত্র মূলধন। চেনাজানা বন্ধু-বান্ধব ৬জনের কাছ থেকে প্রায় ২১ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনমাস আগে পাহাড়ী ছন আর বাঁশ দিয়ে দর্শনীয় স্থান চিম্বুক, নীলগিরি, থানচি সড়কের পাশে পাহাড়ের ঢালুতে শুরু করেছেন স্বপ্নের কুটির (দোকান), যার নাম রেখেছেন “ইয়াংবং আইস ব্রেকিং হাউস” (Yang Bong Ice House)। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই নামে ফেসইবুক পেইজও খুলেছেন। যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লোকজন পাহাড়ের উৎপাদিত মৌসুমি অর্গানিক ফ্রুটস অর্ডার করতে পারবেন।

বান্দরবান শহর থেকে ১৪ কি.মি. দূরে চিম্বুক সড়কে গেলে দেখা মিলবে ‘ইয়াংবং আইস ব্রেকিং হাউস’ নামের একটি দোকান। সেখানে চা-কফি, বিস্কুট, আচার আর পাহাড়ী উৎপাদিত বিভিন্ন রকমারি ফল পাওয়া যায়। আর কুটিরে বসে বিশ্রামও করতে পারবেন। মাচাং ঘরে বসলেই উপভোগ করতে পারবেন প্রকৃতি মুগ্ধ করা হাওয়া আর সেই সাথে নিচে তাকালে দেখা মিলবে পাহাড়ীদের জুম চাষ ও তাদের জীবনবৈচিত্র্য এবং পাহাড়ের পাদদেশের ছোট ছোট কুটির।

হাউস গড়ে তোলার পেছনের গল্প প্রসঙ্গে বলেন, এই হাউস তোলার মূল উদ্দেশ্যে হচ্ছে পাহাড়ী সম্প্রদায়ের বিলুপ্তপ্রায় বই ও ছবি বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে একটি পাঠাগার তৈরি করা।

এমন পরিবেশে পাঠাগার তৈরি করে কতটুকুই বা উপকারে আসবে সেই কথার প্রসঙ্গে যুবকটি বলেন, লাইব্রেরিটা গতানুগতিক না হয়ে ঠিক জাদুঘরের আদলে তৈরি করার চিন্তা করছি। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত যতগুলো ভাষাভাষী আদিবাসী মানুষ আছে। তাদের নামে এক-একটি কটেজ তৈরি হবে। এক-একটি সম্প্রদায়ের নামসহ কটেজের নামকরণ হবে ‘হারিয়ে যাওয়া ভূমি’ নামে। যেমন- এই পাহাড়টি ম্রো জনগোষ্ঠী ‘ইয়াংবং’ নামে একসময়ে আদিভূক্ত ছিল। বর্তমানের প্রজন্ম সেটা ভুলে গিয়ে, সবাই চিম্বুক পাহাড় নামে চিনতে শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন আমাদের সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, ঐতিহ্য সবকিছু ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে।

এখানকার স্থানীয়দের সাথে সংযোগ স্থাপন তৈরি করার প্রসঙ্গে বলেন, এখনকার স্থানীয়রা যখন এই কুটিরে আড্ডা দিতে বা ঘুরতে আসবে তখন তাদের সাথে কথা হবে আর আমার স্বপ্নের কথাগুলো তাদেরকে শেয়ার করতে পারবো। সবকিছু চিন্তা করে নিজের বাহ্যিক কথাগুলো এখানকার বসবাসরত জনগোষ্ঠীদের  শেয়ার করা তার এই হাউস তৈরি করার মূল উদ্দেশ্য।

এই জাদুঘরটি কোথায় তৈরি করা হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, গ্রামের পাশে নিজস্ব কিছু জায়গা-জমি আছে। সবার কাছ থেকে সার্বিক সহযোগিতা পেলে যদি সম্ভব হয় স্বপ্নের সেই জাদুঘর তৈরি করার চিন্তা রয়েছে। জানি না আমার স্বপ্নের চিন্তাধারা পূরণ হবে কিনা।
জাদুঘরটি তৈরি হয়ে গেলে যারা বাইরে থেকে ঘুরতে আসবেন, এখানে এলে প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীদের যা যা বিলুপ্ত হয়ে গেছে সেই সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন বলে মত দেন এই উদ্যোক্তা।

লেখাপড়া শেষ করার পর তার ইচ্ছের কথা জানতে চাইলে বলেন, পৃথিবীর যে প্রান্তে বাস করি না কেন, পাহাড়ের টান সবসময় থাকবে। পাহাড়ে যেহেতু জন্ম, সেই টানে হলেও আমাকে আসতে হবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করতে।

এভাবেই কয়েকজন শিক্ষিত সংগ্রামী যুবক পিছিয়ে পড়া পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু করার প্রয়াসে স্বপ্নের জাল বুনে। উচ্চশিক্ষা অর্জন করে সু-শিক্ষিত হয়ে তাদের মাধ্যমে আগামীতে এই পাহাড়ের রূপ পালতে যেতে পারে বলে নতুন প্রজন্মের বিশ্বাস।