করোনাকালে আইনের আশ্রয় লাভ কিংবা সুবিচার প্রাপ্তিতে সরব আদালতের অনুপস্থিতি আর কত !

প্রকাশিত: ৫:৫৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একটি রাষ্ট্রযন্ত্র তিনটি চাকার উপর ভর দিয়ে চলে। আর সে তিনটি চাকা হল – আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং বিচার বিভাগ।রাষ্ট্রযন্ত্রটি চালানোর প্রয়োজনীয় আইন প্রনয়ণ করে আইনবিভাগ বা আইনসভা বা পার্লামেন্ট। পার্লামেন্ট প্রণীত আইনসমূহ কার্যকর করে নির্বাহী বিভাগ বা সরকার। আইনের ব্যখ্যা প্রদান, আইন ভঙ্গ, আইনের অপপ্রয়োগ,দেশে অবস্থানরত মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হলে মোদ্দা কথা হল কোন বিরোধ সৃষ্টি হলে আইনানুযায়ী উক্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা বিচার বিভাগের কাজ।

দেশে সর্বপ্রথম নভেল করোনা ভাইরাস(কভিড-১৯) রোগী শনাক্ত হয় চলতি বছরের ৮ মার্চ।এই কভিড-১৯ রোগটিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক মহামারী হিসাবে আখ্যায়িত করার পর এই রোগটিকে নিয়ন্ত্রণের লক্ষে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় আমাদের দেশের সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতঃ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করে।

আধাসরকারি, বেসরকারি, শায়ত্বশাসিত সকল প্রতিষ্ঠান এবং সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও সরকারের নির্দেশনায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সরকারের নির্দেশনায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও মানুষের যাতায়তের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। যথারিতি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টও দেশের আদালতগুলোতে প্রথমে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারন ছুটি ঘোষনা করে। পরবর্তীতে দফায় দফায় এই সাধারণ ছুটির মেয়াদ বাড়াতে থাকে।মে মাসের শুরুতে সরকার বিচার বিভাগকে সীমিত পরিসরে কার্যকর করার প্রয়োজন অনুভব করে। মামলার পক্ষ, আইনজীবী, বিচারকের শারীরিক উপস্থিতি ব্যতিরেকে আদালতগুলোকে সীমিত পরিসরে কার্যকর করার লক্ষে আদালত কর্তৃক তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার অধ্যাদেশ- ২০২০ প্রনয়ণ করে সরকার। এই আইনের অনুবলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে শুধুমাত্র জেল হাজতে থাকা অভিযুক্তের জামিনে মুক্তি সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করার নিমিত্তে আদালতগুলোকে নির্দেশনা প্রদান করে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। ভার্চুয়াল পদ্ধতি পুরোপুরি কার্যকর হলে স্বল্প সময়ে এবং স্বল্প খরচে দেশের মানুষ ন্যায় বিচার পাবেন। কিন্তু একটি নিরাপদ ও কার্যকর ভার্চুয়াল আদালতের কার্যপদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে নিরাপদ ওয়েব সাইট, অ্যাপ তৈরী, মামলার নথির নিরাপদ ডকুমেন্টেশন, ভার্চুয়াল শুনানীর উপযোগী দ্রুত গতি সম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিচারক, আদালতের কর্মচারীগণকে প্রশিক্ষন প্রদান, আইনজীবী, অ্যাভোকেটস্ ক্লার্ক সর্বোপরি বিচারপ্রার্থী জনগণকে এই পদ্ধতিতে অভ্যস্তকরণ অনেক সময় সাপেক্ষ বিষয়।

অন্যদিকে সরকার প্রণীত অধ্যাদেশটি আইন আকারে প্রণয়ণের নিমিত্তে জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে টেকনিক্যাল মূল্যায়নের জন্য অপেক্ষমান। সংবিধানের ১০৭ অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বিধি প্রণয়নের এখতিয়ার রাখেন।এই এখতিয়ার বলে সুপ্রীম কোর্ট সংক্রামক ব্যধি, অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগকে বিবেচনায় রেখে একটি বিধিমালা প্রণয়ন করতে পারেন। আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও ২০১৮ সালের সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইনের আওতায় সময়োপযোগী পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যবিধি প্রণয়ন করতে পারেন।

বর্তমান ভার্চুয়াল পদ্ধতি এবং নন ভার্চুয়াল পদ্ধতির সমন্বয় সাধন করে দেশের সকল চলমান মামলা সচল করতঃ জনগণের আইনি সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।দেশের নিয়মিত আদালত ব্যবস্থায় বিচারকের বসার স্থান, সাক্ষীর দাড়ানোর স্থান, মামলার পক্ষগণের দাড়ানোর স্থান মোটামুটি নিরাপদ দূরত্বে অবস্থিত।নিয়মিত আদালত ব্যবস্থায়ও মামলার পক্ষগণ ও আইনজীবীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে আদালত কার্যকর রাখা সম্ভব। যে মামলাগুলোতে মামলার পক্ষগণের উপস্থিতি অত্যাবশ্যকীয় নয়, সে মামলাগুলোতে শুধুমাত্র নিয়োজিত আইনজীবীকে শুনে, মামলার পক্ষগণের অত্যাবশ্যক উপস্থিতির ক্ষেত্রে পূর্ব থেকে মামলা শুনানীর সময় নির্ধারণ করে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আদালত কার্যকর রাখা সম্ভব।আবার ভার্চুয়াল ও নন ভার্চুয়াল পদ্ধতির সমন্বয় সাধন করে আলাদা শিফটে আদালতের কার্যক্রম নিয়মিত রাখা যায়।

বর্তমানে বিচার বিভাগের শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ কাজ বন্ধ আছে।এই যে রাষ্ট্রের তৃতীয় স্তম্ভ বিচার বিভাগের প্রায় সব কাজ বন্ধ আছে, তাতে দেশের ক্ষতি কি হচ্ছে তা একবার ভাবার সময় নাগরিক হিসাবে আমার আপনার কারো কি আছে? বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, অ্যাভোকেটস্ ক্লার্ক, আদালত অঙ্গনের টাইপিস্ট, ভেন্ডর, দোকানদারসহ আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রত্যেকে ভাবছেন নিজ নিজ ক্ষতির অংশটা নিয়ে।একটু সুক্ষ্মভাবে ভাবলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়।বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে বিগত ৩১ ডিসেম্বর’২০১৮ পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৩৫ লাখ ৮২ হাজার ৩৪৭টি। বর্তমানে চলমান মামলার পরিমাণ ৪০ লাখের কম নয়। আর দেশে চলমান বিরোধের পরিমাণ কত তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা সম্ভব নয় এ মুহূর্তে। কারণ দেশে অবস্থানরত ( বাংলাদেশি ও সাময়িকভাবে অবস্থানরত বিদেশী) মানুষের বিচার চাওয়ার দ্বার বন্ধ। আমাদের দেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইনের আশ্রয় লাভ, আইনানুযায়ী এবং কেবল আইনানুযায়ী আচরণ লাভ দেশের প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে অবস্থানরত বিদেশীদের মৌলিক অধিকার। বিচার চাওয়ার প্রধান দ্বার আদালত বন্ধ থাকায় মানুষ এই গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।একটি চলমান বিরোধ মানুষের কি কি ক্ষতি করে তা বিশ্লেষন করার প্রয়োজন অনুভব করার জায়গা থেকে আমার এই লেখা। সময়ের প্রয়োজনে জনগণের চাহিদায় পার্লামেন্ট আইন প্রনয়ণ করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যার যার ধর্মীয় রিতি আনুযায়ী দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করা মৃত ব্যক্তির অধিকার। মৃত ব্যক্তির এই অধিকার নিশ্চিত করণ এবং স্বাস্থ্য সেবা বঞ্চিত জনগণের বিচার চাওয়ার দ্বার আদালত বর্তমানে অকার্যকর।

বিরোধ যদি মানুষ বা কোন প্রাণীর শরীরের অধিকার সংক্রান্ত হয়,তাকে আইনের ভাষায় ফৌজদারী অপরাধ বলে।বিরোধটি কোন ‘পদ’ বা স্থাবর কিংবা অস্থাবর সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত হলে,তাকে আইনের ভাষায় দেওয়ানী বিরোধ বলা হয়। বিরোধের প্রকারভেদে ক্ষতির পরিমাণ নিম্নরূপে আন্দাজ করা যায়।

ফৌজদারী মামলা:
সব ফৌজদারী মামলাই পুরোপুরি সত্য নয়। কিছু মামলা সত্য, কিছু মামলা অতিরঞ্জিত আর কিছু মামলা পুরোপুরি মিথ্যা। ফৌজদারী মামলা চলমান থাকলে দেশের বা দেশের মানুষের যে যে ক্ষতিগুলো হয় তা দেখার চেষ্টা করা যাক;

১। একটি ফৌজদারী মামলা চলমান থাকলে-

(ক) মামলার অভিযুক্ত ব্যক্তি পাসপোর্ট পায় না। ফলে অভিযুক্ত ব্যক্তি জীবিকা বা অন্য কোন প্রয়োজনে দেশের বাইরে যেতে পারেনা।

(খ) মামলার অভিযুক্ত ভাল কোন চাকরি পায় না।ফলে তার বেকারত্বের অবসান হয় না।

(গ) সরকারি চাকরিজীবী অভিযুক্ত হলে যতদিন মামলা শেষ না হয় ততদিন সাসপেন্ড থাকে। ফলে অভিযুক্তের বেতন এবং ক্ষেত্রবিশেষে পেনশন আটকে যায়।

(ঘ) অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশ আরও এক বা একাধিক ফৌজদারী মামলায় জড়ানোর সম্ভাবনা থাকে।

(ঙ) কখন তার মামলা শেষ হবে সেই চিন্তায় অভিযুক্ত মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

(চ) মামলা চলমান থাকলে অভিযুক্তের অর্থ,সময়, শ্রম ইত্যাদির অপচয় হয়।

২। দেওয়ানি মামলা চলমান থাকলে-

(ক) মামলাটি যদি ‘পদ’ সংক্রান্ত হয়, সেক্ষেত্রে কখন মামলা শেষ হবে, বিবাদী কখন তার পদে ফিরবেন বা ‘পদ’ ফিরে না পেলে কখন নতুন কোন ‘পদ’ বেছে নিবেন, সেই চিন্তা আর অপেক্ষায় তার শ্রম, সময় ও অর্থের অপচয় হয়।

(খ) মামলাটি স্থাবর সম্পত্তির অধিকার সংক্রান্ত হলে,যতদিন মামলা শেষ না হয়, ততদিন ঐ সম্পত্তিতে উৎপাদনমুখি কিছুই করা যায় না; ফলে মামলার পক্ষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি সরকার একটি বড় অংকের রাজস্ব বঞ্চিত হয়।

(গ) ব্যাংক বা দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির বা দেশের কোন ব্যক্তির দায়েরকৃত ঋণ সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি না হলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তার টাকা ফেরত পায় না; অর্থাৎ অর্থ সংক্রান্ত মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাদীর প্রাপ্য টাকা ফেরত পাওয়ার কোন সুযোগ থাকেনা।

একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র সচল, কার্যকর এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ ছাড়া কল্পনা করা যায়না। এমতাবস্থায় জনগণের বিচার চাওয়ার মতো সংবিধান সম্মত মৌলিক অধিকারটি কার্যকর করার নিমিত্তে সরকার কর্তৃক নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাষ্ট্রের তৃতীয় স্তম্ভ বিচার বিভাগ সচল করা এখন সময়ের দাবী।

লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

মুক্তমত’ বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ‘দেশ অরণ্য’ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।