স্বাস্হ্য ব্যবস্থার আপাদমস্তক বদলানো সময়ের দাবী

প্রকাশিত: ২:৫১ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২০

সাধারণত আমাদের শরীরে রোগব্যাধি বা দুর্বলতা না হওয়ার কারণে ঔষধ সেবন থেকে মুক্ত থাকলেই স্বাস্থ্য ভালো থাকা মনে করি। কিন্তু, এসব স্বাস্থ্য কী জিনিস তা বুঝাতে গিয়ে WHO বলছেন, উপরোক্ত রোগমুক্ত থাকলেই হবে না,পরিপূর্ণ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে সুস্থ থাকতে হবে।

স্বাস্থ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু, এই অধিকার বর্তমানে কতটুকু অর্জিত হয়েছে ? বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের স্বাস্থ্য সেবার প্রাপ্তি কতটুকু? এই অধিকাংশ মানুষ বলতে নিম্নমধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী, কৃষক, বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ এমনকি মধ্যবিত্ত ও৷ এটাতো ঠিক যে, বাংলাদেশের একটি অংশ অসুস্থ হলে প্রায়শঃ সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এমনকি পশ্চিমাদেশে গিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে। সিঙ্গাপুর তো মনে হয় ঐসব অসুস্থ মানুষের পাশের বাড়ি।

বিশাল ময়লা আবর্জনা স্তুপের মধ্যখানে বিশাল সুন্দর অট্টালিকায় বাস করলেই যে, সু- স্বাস্হ্যের অধিকারী হয়ে যাবে, সেই অট্টালিকায় সর্বদা সু- স্বাস্হ্যের বাতাস বয়ে যাবে এমনটি যারা ভাবে নিশ্চয় তাদের বোকা বলা যায়। এই বোকা কিংবা স্বার্থপরদের কার্যকলাপে হয়তো চোখ ধাঁধানো অবাক করা অর্থনৈতিক জৌলুস আছে। কিন্তু, ঐ জৌলুস ফিকে হতে সময় লাগে না যখন চারদিকে আবর্জনা স্তুপের দম বন্ধ হওয়া বিশ্রী ঘ্রাণ ঐ চোখ জুড়ানো অট্টালিকাকে ছেয়ে যায়৷ বলতে দ্বিধা নেই, ঐ অট্টালিকা হলো সিঙ্গাপুর গামী ভদ্রপাড়া আর আবর্জনা স্তুপ আজ সমগ্র বাংলাদেশ। এটাই আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ অবস্থা। এই বাস্তবতার চিত্রের চিত্রায়ন হয়েছে কোভিড-১৯ এর প্রযোজনায়।

চিকিৎসা সেবাকে গ্রাম, মফস্বল এমনকি জেলা থেকে গুটিয়ে নিয়ে বিভাগ কেন্দ্রিক বিশেষত রাজধানীকেন্দ্রিক করা হয়েছে। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতাসহ বিভিন্ন কারণে সেই ঢাকাস্থ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলোও বর্তমান সংকটে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। তখন বুঝতে বাকী নেই, সংবিধানের ১৫ ক, এবং ১৮(১) অনুচ্ছেদ ডুকরে কাঁদছে। একই সাথে চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত মানুষের আকুতি বেড়েই চলেছে। এই আকুতি বৃদ্ধির তৎপরতা হয়েছে কৌশলে। TIB’ র ২০১৭ সালের ” সরকারি সেবা খাতের দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ – ২০১৭” এর গবেষণায় বলছে যে, ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য খাতে ঘুষের শিকার ১৬.৭%, সেটি ২০১৭ সালে বেড়ে হয়েছে ১৯.৮%। সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে গেলে ৮.৪% সেবা গ্রহীতাকে বেসরকারী ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। ওই পরিস্থিতিতে এই ধরনের পরামর্শ রোগী বা রোগীর সাথে যিনি থাকেন তাদের পক্ষে মেনে নেয়া স্বাভাবিক। তাছাড়া, বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে অধিকাংশ রোগ নির্ণয় না হওয়ায় এবং সরকারি ডাক্তাররাও সেইসব প্রতিষ্ঠানে চেম্বার করার কারণে বেসরকারী সেবা প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে বাধ্য হয়৷

বেসরকারী সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গুণগত তারতম্য প্রকট। আবার মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের তুলোনায় সংখ্যা বেশি। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফাকেন্দ্রিক। অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করানোর অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসা ব্যয় বেশি হবার কারণে রোগীর পরিবার সর্বশান্ত হয়ে যাবার অভিজ্ঞতা বিরল নয়।

বেসরকারী সেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রধান আইন হলো- The Medical Practice and Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance 1982. এই অধ্যাদেশটি ১৯৮৪ সালে সংশোধিত হয়। এটি একটি অপূর্ণাঙ্গ আইন। এই আইন যেমনি বেসরকারী স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানের সেবার মান নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে তেমনি এই অধ্যাদেশ লংঘনের দায়ে ঐ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জোরালো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় না। স্বাস্থ্যনীতি ২০১১ প্রণীত হয়েছে। ৯ বৎসর অতিক্রান্ত হবার পথে এই স্বাস্থনীতির কৌশল সমূহ বাস্তবায়িত হয়েছে মর্মে কেউ দাবী করতে পারবে না। একই সাথে কৌশল সমূহ বাস্তবায়নের অগ্রগতিতে পর্যাপ্ত গতি আছে বলে মনে হয় না। তাছাড়া, নতুন অনেকগুলো আইন বিভিন্ন স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে আটকে আছে।
মানুষ ব্যাংকে একাউন্ট না খুলে জীবন পার করে দিতে পারে। কিংবা অনেক সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট না হয়ে বেঁচে থাকতে পারে। কিন্তু স্বাস্থ্য হানি হলে তাকে চিকিৎসা সেবা নিতেই হবে। মানুষের এই সাংবিধানিক অধিকার ভূলুন্ঠিত। তাই, বিদ্যমান অসম্পূর্ণ, সীমাবদ্ধ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত আইন, নীতি এবং নির্বাহী আদেশে পরিচালিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ করোনায় আক্রান্ত রোগীর শ্বাস কষ্টের যন্ত্রণার মত যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে মেহনতী মানুষকে।

এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তির প্রথম ধাপ হতে পারে পুরো স্বাস্থ্য খাতকে একটি সাংবিধানিক কমিশন গঠনের মাধ্যমে তার উপর ন্যস্ত করা। চলমান আমলা নির্ভরতার বিচ্ছেদ ঘটিয়ে স্বাস্থ্য খাতের সাথে সম্পর্কিত মানুষের উপর স্বাস্থ্য খাতের দ্বায়িত্ব প্রদান করা। চিকিৎসক, চিকিৎসাবিদ, জনস্বাস্হ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞদের প্রাধান্য দিতে হবে। আবার ভারসাম্য আনায়নের জন্য সিভিল সোসাইটি, পেশাজীবীদের সমন্বয় ঘটাতে হবে। এই বিষয়ে যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করছে তাদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। এমনকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবী, সমালোচনা আমলে নিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্যই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আপাদমস্তক পরিবর্তন সময়ের দাবী। কারণ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা করোনার শ্বাসকষ্টে ভুগছে।

লেখক : অ্যাডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে ‘দেশ অরণ্য’ আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।