শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২০, ০৬:২৩ পূর্বাহ্ন

ভুয়া বিল-ভাউচারে রাজস্ব মেরামত প্রকল্পে লুটপাটের অভিযোগ

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, লামা (বান্দরবান)
  • আপডেট সময় বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২০
  • ২২৯ পাঠক সংখ্যা
লামা উপজেলার ত্রিডেবা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রংয়ের কাজ চলমান। ২৫ জুলাই ২০২০ইং তোলা ছবি।

লামা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে অনিয়ম (ধারাবাহিক ৩ পর্বের ১ম পর্ব)

বান্দরবানের লামায় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগে অনিয়মকে নিয়ম আর ভুয়া বিল-ভাউচারকে ঠিক রেখে রাজস্ব খাতে স্কুল মেরামতের টাকা আত্মসাৎ ও নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলায় ৮৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৭টি বিদ্যালয়ে রাজস্ব খাত থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এ রাজস্ব মেরামত প্রকল্পের অধিকাংশ বিদ্যালয় নামেমাত্র কাজ দেখিয়ে বেশিরভাগ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে ভুয়া বিল-ভাউচার করে। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়ে কত বরাদ্দ বা কাজের ব্যাপারেও জানেন না সহকারী শিক্ষকরা বা কমিটির সদস্য।

জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে উপজেলার ২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রাজস্ব মেরামত প্রকল্পে ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। কিন্তু বেশকিছু বিদ্যালয়ের কাজের নামে কাগজে ভুয়া ভাউচার দাখিল করেই পকেট ভারী করারও অভিযোগও উঠছে। আবার নামেমাত্র কাজ দেখিয়ে সিংহভাগ টাকা ভাগাভাগি হয়ে চলে যাচ্ছে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কতিপয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির পকেটে। সঠিক তদন্তে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যাবে বলে দাবি করছেন স্থানীয় অনেকে।

সরজমিনে ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ত্রিডেবা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় স্কুলে রংয়ের কাজ চলছে। স্কুল কমিটির সদস্য ও স্কুলের অভিভাবকের সাথে আলাপকালে জানা যায়, বিদ্যালয়ে রংয়ের কাজে বাহিরে ওয়েদার কোট ও ভিতরে প্লাস্টিক পেইন্ট ব্যবহার উল্লেখ করে বিল ভাউচার করা হলেও তার ব্যবহার হয়নি। স্কুল সংস্কারে ২০ হাজার টাকার বালু ও কংকর ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হলেও বিদ্যালয়ে তার অস্তিত্ব মিলেনি। বিগত দিনে স্কুলের সকল উন্নয়ন কাজে পাশের ঝিরির বালু ব্যবহার হয়েছে বলে জানা যায়। মনগড়া মিস্ত্রির বেতন দেখানো হয়েছে। নিজেদের মতো ভাউচার বানিয়ে ক্যাটাগরি অনুযায়ী ভ্যাট দিয়ে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। ভাউচারের বিষয়ে দোকানদাররা কিছু জানেন না উল্লেখ বলেন, অনেক শিক্ষক আমাদের কাছ থেকে খালি ভাউচার নিয়ে যায়।

২৯ জুলাই ২০২০ইং স্কুলের এসএমসি কমিটির সভাপতি আব্দুল খালেকের সাথে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি বলেন, মেরামতের জন্য ৬/৮ ব্যাগ সিমেন্ট ক্রয় করেছি অথচ বিলে ২০ ব্যাগ সিমেন্ট ক্রয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্কুলে কত বরাদ্দ এসেছে আমি জানিনা। শুধুমাত্র স্লিপের ৫০ হাজার টাকার বিষয়ে আমি জানি। তিনি আরো বলেন, স্কুলে কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে বিল তুললে বলতে পারব অথচ গত ১৫ জুন ২০২০ইং তারিখে তার স্বাক্ষরিত বিল জমা দিয়ে ৩০ জুন সরকারি হিসাব হতে সম্পূর্ণ কাজের বিল উত্তোলন করা হয়েছে। আব্দুল খালেক গত ১৫ জুন তারিখের বিল-ভাউচারে স্বাক্ষরের বিষয়ে জানেন না বলে জানান। স্কুলের অভিভাবক মনিরুজ্জামান বলেন, স্কুল ভবনটি খুবই জরাজীর্ণ। পরিত্যাক্ত ভবনে রংয়ের কাজ চলছে।

কাগজেপত্রে ৩০ জুন কাজ শেষ দেখানো হলেও এখনো ২০ শতাংশ কাজ হয়নি কেন ? এমন প্রশ্নের জবাবে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মংয়ইনথিন মার্মা বলেন, নিয়মে আছে তাই দেখিয়েছি। কাজ চলমান রয়েছে।
রুপসীপাড়া ইউনিয়নের চিংকুম পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক সুভাষ কান্তি মজুমদার বলেন, সরকারি খাত থেকে বিল উত্তোলন হলেও আমি এখনো এক টাকাও পায়নি। ২৫ হাজার টাকার টেবিল বানাতে দিয়েছে। ইদুল আযহার পরে বাকী কাজ ধরব।

একই ভাবে বরাদ্দ প্রাপ্ত ২৭টি স্কুলে শতভাগ কাজ দেখিয়ে সরকারি হিসাব থেকে গত ৩০ জুন শতভাগ টাকা উত্তোলন করা হলেও এখনো অনেক স্কুল মেরামতের কাজ শুরু হয়নি। কিছু স্কুলে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কাজ করে পুরো টাকা জায়েয করার পায়তারা চলছে। গত অর্থবছরের জুন মাস শেষ হয়ে গেলেও বরাদ্দ পাওয়া বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ কাজই এখনো করা হয়নি। এছাড়াও বিদ্যালয়ে কী কাজ করা হয়েছে সেটিও বলতে পারেননি বেশিরভাগ সহকারী শিক্ষকগণ।

উপজেলা এলজিইডি অফিসের প্রকৌশলীরা বিদ্যালয়ে গিয়ে পরিদর্শন শেষে কাজের ওপর প্রতিবেদন দেওয়ার পর সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তারা বিদ্যালয়ে গিয়ে কাজের অগ্রগতি ও গুণগত মান যাচাই করে বিল ছাড় করবেন বলে নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করে শুধু বিল-ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তপন কুমার চৌধুরীর সঙ্গে কথা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কাজের মান যাচাই করে বিল প্রদান করা হবে। এছাড়াও কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

এ জাতীয় আরো সংবাদ
error: